‘বিশ্ব ইজতেমা কি গরিবের হজ’— ইসলাম কী বলে? – News Portal 24
ঢাকাFriday , ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৪

‘বিশ্ব ইজতেমা কি গরিবের হজ’— ইসলাম কী বলে?

নিউজ পোর্টাল ২৪
ফেব্রুয়ারী ২, ২০২৪ ১:১২ পূর্বাহ্ন
Link Copied!

আলমী শূরার বিশ্ব ইজতেমা শুরু হবে আজ শুক্রবার (২ ফেব্রুয়ারি) বাদ ফজর আম বয়ানের মাধ্যমে। বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে আসতে শুরু করেছেন তাবলিগ জামাতের সাথীরা। কানায় কানায় পূর্ণ হয়েছে ময়দান। অনেকেই অবস্থান নিয়েছেন মাঠের পাশের রাস্তা ও ফুটপাতে।

বিশ্ব ইজতেমা মূলত তাবলিগ জামাতের সঙ্গে যুক্ত মুসলিমদের একত্রিত হওয়ার একটি মাধ্যম। এখানে একত্রিত হয়ে তারা তাবলিগের গুরুত্বপূর্ণ মুরব্বি আলেমদের বিভিন্ন বয়ান ও ধর্মীয় কথা শুনে থাকেন।

প্রতিদিন ফজর নামাজের পর থেকে এশার নামাজের আগ মুহুর্ত পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালার ওপর ঈমান দৃঢ় করা ও ব্যক্তি জীবনের সব ক্ষেত্রে ইসলামকে কিভাবে ধারণ করা যায় এখানে এই বিষয়েই আলোচনা করা হয় বলে জানিয়ে থাকেন সংশ্লিষ্টরা।

কিছু মানুষের মাঝে তাবলিগের বিশ্ব ইজতেমা নিয়ে কিছু কিছু ভুল ধারণা রয়েছে, যেমন কেউ কেউ বলে থাকেন বা মনে করেন, ইজতেমায় এলে গুনাহ মাফ হয়ে যায়। কেউ একে গরিবের হজ ভেবে থাকেন। আরেকটি বিভ্রান্তি রয়েছে, বিশ্ব ইজতেমার মোনাজাতকে ঘিরে। ইসলাম সম্পর্কে অল্প ধারণা রয়েছে, এমন কেউ কেউ মনে করেন, ইজতেমার মোনাজাতে অংশ গ্রহণ করলেই দোয়া অবশ্যই কবুল হয়।

কিন্তু এমন ধারণা ঠিক নয় বলে মন্তব্য করে থাকেন ইসলামি চিন্তাবিদেরা।

ইসলামি চিন্তাবিদের মতে, হজ ইসলামের অন্যতম ফরজ বিধান। নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের মালিকের ওপর নির্দিষ্ট জায়াগায় তা পালন করা ফরজ। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেছেন, ‘যাদের নিকট এই ঘর (কাবা শরিফ) পর্যন্ত পৌঁছার সামর্থ্য আছে, তাদের ওপর এই ঘরের হজ করা ফরজ। ’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯৭)

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘হে লোক সকল! আল্লাহ তোমাদের উপর হজ ফরজ করেছেন। সুতরাং তোমরা হজ কর।’ (বুখারী, অধ্যায়, কিতাবুল হজ)

ফরজ হজ সম্পর্কিত এই আয়াত ও হাদিস বর্ণিত হয়েছে ইসলামের প্রথম যুগে, বর্তমান সময় থেকে আরও সাড়ে ১৪ শত বছর আগে। এদিকে সাধারণ মুসলমানদের ইসলামের বিধান মানার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে গত শতকে ১৯২৪ সালে তাবলিগ জামাত প্রতিষ্ঠিত হয়। এর আরও পরে ১৯৬৭ সালে শুরু হয় বিশ্ব ইজতেমা। তাই একে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধান বা ফরজ কোনও বিধানের সঙ্গেও মেলানোর কোনও যৌক্তিকা নেই।

এ বিষয়ে আন নূর জামে মসজিদের খতিব ও মাদরাসা আবু রাফে (রা.)-এর পরিচালক মাওলানা আলী হাসান তৈয়ব বলেন, ইজতেমার মোনাজাতকে যেভাবে গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা শুরু হয়েছে এর জন্য তাবলিগ বা ইজতেমা সংশিষ্টরা নয় বরং সাধারণ মানুষ নিজেরাই দায়ী। তাবলিগের সাথী বা সচেতন মুসলিমদের কেউ একে হজের সঙ্গে তুলনা করতে যান না বা এমন কিছু তারা কখনও ভাবেনও না।

তার মতে, ইজতেমাকে ইসলামের মৌলিক ইবাদত বা পঞ্চ স্তম্ভের সঙ্গে তুলনার কোনও প্রশ্নই আসে না।

‘মিডিয়াতে বিশ্ব ইজতেমাকে হজের পরে দ্বিতীয় বৃহত্তম গণজমায়েত বলে প্রচার করা হয়, এর ফলে ইসলাম সম্পর্কে কম জানা সাধারণ মুসলিমদের অনেকে এমন ভাবনার কিছুটা সুযোগ পান’ তাই প্রচারণার ক্ষেত্রেও কিছুটা সচেতনতা কাম্য বলেন তিনি।

তিনি বলেন, ইজতেমায় জুমার নামাজকে কেন্দ্র করে মুসল্লিদের ঢল নামে, অনেকেই এই জুমাকে বিশেষ ফজিলতপূর্ণ মনে করেন। কিন্তু এর আলাদা কোনও ফজিলত নেই। তাই ইজতেমার ময়দান থেকেও এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা কাম্য। তাদের পক্ষ থেকে বলে দেওয়া উচিত, এখানে শুধু বয়ান শোনার জন্য আসা উচিত। মাঠের জুমাকে কেন্দ্র করে এখানে জমায়েত না করার জন্য বিশ্ব ইজতেমা সংশিষ্টদেরও মানুষকে সচেতন করা উচিত।

তার মতে, ইজতেমা সংশিষ্ট কেউ এখানে জুমা পড়াকে বা আখেরি মোনাজাতে অংশগ্রহণকে ফজিলতপূর্ণ বলেন না। কিন্তু কিছু মানুষের মাঝে যেহেতু এমন ধারণা ছড়িয়েছে তাই তাবলিগের সাথী ও আলেমদের পক্ষ থেকে মানুষকে বিষয়টি বোঝানো উচিত।

তিনি বলেন, অনেকে বৃহৎ জামাতের ফজিলতের আলোকে ইজতেমার জুমাকে বিশেষ জুমা হিসেবে প্রমাণ করতে চান, এটা আদৌ ঠিক নয়, কারণ এর ফলে ইসলামে বিকৃতি সাধন করা সহজ হয়, তাই এ থেকে দূরে থাকা কাম্য।

তিনিও আরও ‍যুক্ত করেন, অনেকেই সচেতনতা তৈরি করতে গিয়ে পুরো আয়োজনকেই বেদআত বলে ঘোষণা করেন এটাও ঠিক নয়, বরং মধ্যমপন্থা অবলম্বন করে মানুষকে বোঝানো উচিত।

প্রশ্ন: ইজতেমায় আসলে কী হয়? কী শেখানো হয়? কী করে সময় কাটে মুসল্লিদের? আর ইজতেমার দ্বারা সাধারণ মানুষ উপকৃত হচ্ছে কতটুকু?

এসব প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, ইজতেমার মূল কাজ হলো— বয়ান শোনা। প্রতিদিন ফজর এবং মাগরিবের নামাজের পর লম্বা সময় নিয়ে বয়ান করা হয়। জোহর এবং আসরের নামাজের পরেও ছোট্ট পরিসরে বয়ান হয়। এর ফাঁকে ফাঁকে বিশেষ শ্রেণি-পেশার মানুষদের নিয়ে আলাদা আলাদা বয়ান হয়। এ সময় মাঠে থাকা অন্যরা তালিমের কাজে ব্যস্ত থাকেন।

এ সব বয়ানের মূল উদ্দেশ্য থাকে, মানুষের মধ্যে ঈমানি চেতনা বৃদ্ধি এবং দ্বীনের প্রচার-প্রসারের ভাবনা তৈরি করে তাদেরকে জামাতে বের হওয়ার জন্য উৎসাহিত করা। এক্ষেত্রে শুধু বয়ানের দ্বারা সবাই তৈরি হয়ে যায় না। বরং পুরো ইজতেমার সময় জামাতে লোকজনকে বের করার জন্য আলাদাভাবে তাশকিল (উদ্ধু্দ্ধ) করা হয়।

বর্তমান সময়ে কেউ শুধু কয়েকটা বয়ান শুনে ইসলাম পালন শুরু করবে— এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। তবে ইজতেমার মাঠে কিংবা জামাতে যেয়ে যখন কেউ একনাগাড়ে কিছুটা সময় দ্বীনি পরিবেশে থাকে; তখন তার জন্য ইসলাম মানা ও পালন করা অনেকটা সহজ হয়। এ জন্য শুধু ইজতেমা নয়, প্রায় সবক্ষেত্রেই দাওয়াত ও তাবলিগের কাজে মানুষকে বিভিন্ন মেয়াদে জামাতে বের করার চেষ্টা করা হয়।

আর ইজতেমার মোনাজাত হলো, দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে রওয়ানাকারী জামাতের সাথীদের জন্য। ইজতেমার আখেরি মোনাজাত ইজতেমা শেষ; এটা ভেবে করা হয় না। বরং ইজতেমা থেকে অনেক জামাত দেশের বিভিন্ন এলাকায় দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে বের হয়। এসব জামাত রওয়ানা হওয়ার সময় তাদের উদ্দেশ্য নির্দেশনামূলক একটি বয়ান হয়। যাকে হেদায়েতি বয়ান বলা হয়।

বয়ান শেষে দ্বীনের রাস্তায় বের হওয়া সব জামাতের জন্য, সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য, বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আল্লাহতায়ালার রহমত, মদদ আর সাহায্য চেয়ে- বিশেষ মোনাজাত করা হয়। এই মোনাজাতের পর জামাতগুলো তাদের গন্তব্য জেনে সে উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়।

হজরত নবী করিম (সা.) কোথাও কোনো দল বা জামাত পাঠালে এভাবে তাদেরকে হেদায়েত, নির্দেশনা ও তাদের জন্য আন্তরিক দোয়া দিয়ে বিদায় দিতেন। এ ধারা পরম্পরায় ইজতেমার মাঠে এই বিশেষ দোয়া করা হয়।

প্রাসঙ্গিকভাবে বলে রাখা ভালো, ইজতেমার মূল আয়োজনে ঈমান-আমল থেকে শুরু করে বিভিন্ন ইবাদত-বন্দেগির কথা বলা হয়, কোরআন তেলাওয়াত শেখানো হয়, জিকির করা হয়, নবীদের জীবনী পাঠ করে শোনানো হয়, নফল নামাজ পড়তে উৎসাহী করা হয়, পরোপকারী মনোভাব গড়ার অভ্যাস অনুশীলন করানো হয়। এ ছাড়া অনেক বড় জামাতের সঙ্গে শরিক হয়ে নামাজ আদায়ের সুযোগ মেলে ইজতেমার মাঠে। এসব আমল ও দিক বিবেচনায় ইজতেমায় অংশগ্রহণকে সওয়াবের কাজ মনে হয়। তাছাড়া আলাদাভাবে ইজতেমার কোনো ফজিলত নেই, কোনো সওয়াব নেই।

এখন কেউ যদি বলে বা মনে করে যে, শুধু ইজতেমায় আসলেই সব গোনাহ মাফ হয়ে যাবে, কিংবা তিনবার ইজতেমায় গেলে এক হজের সওয়াব তার আমলনামায় লেখা হবে, ইজতেমা গরিবের হজ- নিঃসন্দেহে এসব ভুল কথা। সবাইকে এসব ধারণা, কথা ও মনোভাব থেকে বিরত থাকতে হবে। কেউ এমন ধারণা পোষণ করলে সেটা সংশোধন করা চেষ্টা করতে হবে।

আল্লাহতায়ালা সবাইকে দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।