‘রমজানে খেজুর খাওয়ার সৌভাগ্য হবে না’ – News Portal 24
ঢাকাThursday , ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৩

‘রমজানে খেজুর খাওয়ার সৌভাগ্য হবে না’

নিউজ পোর্টাল ২৪
ফেব্রুয়ারী ২৩, ২০২৩ ২:২০ অপরাহ্ন
Link Copied!

‘শুনেন, খেজুর হল ইফতারের প্রধান আইটেম। খেজুর দিয়েই অধিকাংশ রোজাদার রোজা ভাঙে। অথচ এ বছর রমজানে সেই সৌভাগ্য হবে না। সব জিনিষের দাম বাড়ছে। খেজুরের দামও নাকি আমাদের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে। এখন বলেন, কেমনে খেজুর কিনব।’ এভাবেই আক্ষেপের সুরে কথাগুলো বলছিলেন মোহাম্মদপুরের চন্দ্রিমা উদ্যান এলাকার বাসিন্ধা নুরুল ইসলাম।

পেশায় চাকরিজীবী এই নুরুল বলেন, আয়ের চেয়ে ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় সব খরচই তো কমিয়ে এনেছি। এবারের রমজানেও খরচ কমানোর কোনো বিকল্প নেই। বাড়তি দামের কারণে হয়ত খেজুরই আর কিনব না।

শুধু নুরুল ইসলাম নয়, এমন আক্ষেপ এখন নিম্ন আয়ের মানুষ তো বটে, মধ্যবিত্তদেরও কণ্ঠে। যে হারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে তাতে, রমজানে খরচ চালানোই কঠিন এ সব পরিবারের।

‘রোজা’ আর ‘খেজুর’ একে অপরের পরিপূরক। সারাবছর খেজুর বিক্রি হলেও রমজান মাসেই খেজুরের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এটা মাথায় রেখেই এক মাস আগে রমজানের জন্য খেজুর আমদানি করা হয়েছে। তারপরও খেজুরের বাজারে অস্থিরতা। রমজানের আরও এক মাস বাকি থাকলেও এখনই যে যেভাবে পারছে সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছে।

বিভিন্ন পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রমজানে খেজুরের চাহিদার বিষয়টিকে পুঁজি করে একশ্রেণির আমদানিকারক, কমিশন এজেন্ট, পাইকার, আড়তদার থেকে খুচরা ব্যবসায়ীরা এখনই খেজুর ও ফলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। তারা বলছেন, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, এলসি খোলার জটিলতা, পরিবহন ব্যয় ও ক্রয়ে বেশি দামের কারণে খেজুর ও অন্য ফলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।

অবশ্য খেজুরের মোকাম বাদামতলীর বিক্রেতারা বলছেন, যথেষ্ট খেজুর আমদানি হয়েছে। সমস্যা হবে না। তবে দামের ব্যাপারে তারা কিছু বলছেন না। এ সুযোগে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে কেজিতে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা বাড়তি দামে বিক্রি করা হচ্ছে।

মোহাম্মদপুর টাউনহল বাজারের ব্যবসায়ী মো. মনির হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অন্য জিনিসের মতো এবার খেজুরের দামও অযৌক্তিকভাবে বেড়েছে। খেজুরের কেজি এক হাজার টাকার বেশি। কিনব কীভাবে? ইফতারির অন্য কিছু কি লাগবে না। শুধু খেজুরে এত টাকা গেলে অন্য আইটেম কীভাবে কিনব? আয় তো আর বাড়েনি।

কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটে বিক্রমপুর ফল বিতানের সামনে কথা হয় আলী হোসেনের সঙ্গে। তিনিও অসহায়ত্ব প্রকাশ করে করে বলেন, আয় কি বেড়েছে যে এত বেশি দামে খেজুর কিনব। চাল, চিনি তেলের মতোই অবস্থা খেজুরের।

সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এই ক্রেতা বলেন, আমাদের বেতন তো বেড়েছে অনেক বছর আগে। সে তুলনায় কিন্তু জিনিসপত্রের দাম বহুগুণ বেড়ে গেছে। ইফতারির প্রধান উপকরণ খেজুরেরও দাম সেই পথে। তাহালে আমরা কিনব কীভাবে?

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অন্যান্য বছরের মতো এবারও দেশে রমজান উপলক্ষে যথেষ্ট খেজুর আমদানি (এলসি খোলা) হয়েছে। এরমধ্যে অক্টোবরে ৪ হাজার ৬৭১ টন, নভেম্বরে ৪ হাজার ৪৭১ টন ও ডিসেম্বরে ১২ হাজার ৮৪১ টন আমদানি হয়েছে। এ ছাড়া গত জানুয়ারি মাসে প্রায় ১০ হাজার টন খেজুর আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে। এভাবে গত চার মাসে প্রায় ৩২ হাজার টন খেজুরের এলসি খোলা হয়েছে।

গত জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এলসি নিস্পাত্তি হয়েছে প্রায় ১২ হাজার টন ও জানুয়ারিতে ৩ হাজার ৫৬১ টন। এভাবে সাত মাসে খেজুরের এলসি নিস্পত্তি হয়েছে ১৫ হাজার ৩৩৫ টন। রমজানের আগে ফেব্রুয়ারি মাসে আরও এলসি নিস্পত্তি হবে। কাজেই চাহিদার তুলানায় দেশে যথেষ্ট পরিমান খেজুর আমদানি হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মেজবাউল হক বলেন, রমজানের আগে দেশে যথেষ্ট খেজুর আমদানি হচ্ছে। ডলার সংকটের কোনো প্রভাব পড়ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংক যথেষ্ট সহযোগিতা করছে।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সূত্র বলছে, দেশে খেজুরের বার্ষিক চাহিদা এক লাখ টন। এরমধ্যে রমজানেই অর্ধেক অর্থাৎ প্রায় ৫০ হাজার টন লাগে। অন্যান্য মাসে লাগে ৫ হাজার টন করে।

খেজুরের ব্যাপারে বাদামতলী বাজারের ফল ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম বলেন, রমজানে যা খেজুর লাগবে তা এসে গেছে। সারা বছরে যা লাগে রমজানে তার থেকে ৬৫ শতাংশ বেশি বিক্রি হয়। এবারে রমজানে কোনো সমস্যা হবে না। তবে ডলারের দাম বাড়তির কারণে খেজুরের দাম একটু বেশি। তবে প্রতি কেজিতে কি পরিমাণ দাম বেড়েছে তা জানাতে পারেননি তিনি।

খেজুরের দাম সম্পর্কে যা বললেন ব্যবসায়ীরা

রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রোজার পণ্যের মধ্যে খেজুরের দাম বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, খুচরা বাজারে জাতভেদে খেজুরের দাম বেড়েছে কেজিতে ৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত। তিউনিসিয়ান জাতের মতো সাধারণ মানের খেজুরের কেজি এখন ১৫০ থেকে ৪৫০ টাকা।

টিসিবির হিসাবে, গত এক বছরে সাধারণ মানের এ সব খেজুরের দাম বেড়েছে ২০ শতাংশ।

কারওয়ান বাজারের বিক্রমপুর ফল বিতানের জনি বলেন, ‘যা বাড়ার আগেই বেড়ে গেছে। এক মাসে আগে ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া আজুয়া খেজুর এখন ৮০০ থেকে ১০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ইরানি মরিয়ম খেজুর বিক্রি হচ্ছে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। এই খেজুরের দাম এক মাস আগেও ছিল ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা কেজি।’

তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে বেশি দাম মেডজুল জাম্বু খেজুরের। প্রতি কেজি ১২০০ টাকা। মেডজুল খেজুর বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১০০০ থেকে ১১০০ টাকা। তবে বেশি বিক্রি হয় খুরমা, আলজেরিয়ান ও বড়ই খেজুর। যার প্রতি কেজি ৩২০ টাকা। খোলা জাহিদি খেজুর বিক্রি করা হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি দরে।

একই বাজারের মায়ের দোয়া ফল বিতানের মনির বলেন, সৌদি খেজুরের দাম বেশি। দাম আগেই বেড়েছে। আগের ৫০০ টাকারটা এখন ৬০০ টাকা কেজি। বর্তমানে কার্টুনে ৫০০ টাকা বেড়েছে। ডলারের কারণে অন্য বারের চেয়ে এবারে বেশি বেড়েছে।

আড়ত, পাইকারের হাত ঘুরে রাজধানীর পাড়া-মহাল্লাতেও যেতে যেতে দাম বেড়ে গেছে খেজুরের দাম। এভাবে দাম বাড়তে থাকায় তা ভোক্তাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। কেরানীগঞ্জের আটি বাজারের ফল ব্যবসায়ী আনিছুর জানান, সব কিছুর দাম বাড়তি। তাহলে খেজুরের দাম বাড়বে না কেন?

তবে টিসিবি বলছে, সাধারণ খেজুরের কেজি ১৫০ থেকে ৪৫০ টাকা। যা এক বছর আগে ছিল ১৫০ থেকে ৩৫০ টাকা। কেজিতে বেড়েছে ১০০ টাকা। কিন্তু টিসিবির বাজারদরে বেশি দামের খেজুরের হিসাব তুলে ধরা হয়নি। কারণ বাজারে সর্বনিম্নে জাহিদি খেজুর ১৫০ থেকে সর্বোচ্চ জাম্বু খেজুর ১২০০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। গড় করলে প্রতি কেজি ৬০০ টাকার বেশি কেজি হয়।