অর্ধেক শরীরে জন্ম নিয়ে দমে যাননি স্মৃতি – News Portal 24
ঢাকাSaturday , ৩০ অক্টোবর ২০২১

অর্ধেক শরীরে জন্ম নিয়ে দমে যাননি স্মৃতি

নিউজ পোর্টাল ২৪
অক্টোবর ৩০, ২০২১ ১১:৫৭ পূর্বাহ্ন
Link Copied!

অর্ধেক শরীর নিয়েই জন্ম। নাড়িছেঁড়া ধনের এ শরীর দেখে রাজ্যের অনিশ্চয়তা ভর করেছিল শিশুটির বাবা-মার চোখেমুখে। শিশুটিকে এক নজর দেখতে লেগেই ছিল এলাকাবাসীর ভিড়। তবে কথায় আছে, ‘রাখে আল্লাহ মারে কে’। প্রকৃতি ও নিজ ভাগ্যের সঙ্গে লড়াই করে সেই শিশুটি বড় হয়ে উঠেছে। অদম্য ইচ্ছা শক্তির জোরে নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে এগিয়ে চলছে স্বপ্নপূরণের পথে।

বলছি ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার ভবানীপুর নামাপাড়া গ্রামের আবেদা আঞ্জুম স্মৃতির কথা। দুই-পা ছাড়াই দেখেন পৃথিবীর আলো। দেড় বছর বয়সে হারান বাবাকেও। মায়ের অভাব-অনটনের সংসারে বেড়ে ওঠা তার। তবে হেরে যাননি জীবনযুদ্ধে। পা না থাকলেও হাতের তালুতে ভর করেই ছুটে চলেন। শুধু তাই নয়, লোকজনের কটু কথা উপেক্ষা করে একের পর এক বাধা পেরিয়ে চালাচ্ছেন পড়াশোনা। করছেন কাজও।

দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে স্মৃতি সবার ছোট। মা সুফিয়া খাতুন গৃহিণী। ভাইয়েরা কৃষিকাজ করেন। মায়ের অভাব-অনটনের সংসারেই তার বেড়ে ওঠা। যখন কিছুটা বুঝতে শিখেছেন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন পড়াশোনা করার। মায়ের কোলে চড়ে বাড়ির পাশে কান্দানিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়া শুরু করেন। প্রাথমিক শেষে ভর্তি হন কান্দানিয়া কচুয়া বাজার দাখিল মাদরাসায়।

প্রতিদিন সকালে মেয়েকে কোলে করে বাড়ির পাশের সড়কে ভ্যান-রিকশায় তুলে দিতেন মা সুফিয়া খাতুন। মাদরাসা ছুটির পর ফের সড়কে গিয়ে মেয়ের জন্য অপেক্ষা করতেন। এভাবে জেডিসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.৫০ এবং দাখিল পরীক্ষায় জিপিএ ৩.৯৪ পেয়ে পাস করেন স্মৃতি। এখন পড়ছেন ভবানীপুর ফাজিল সিনিয়র মাদরাসায় দ্বাদশ শ্রেণিতে। বাড়ি থেকে কোমরে ভর করে হাতে হেঁটে মাটির রাস্তা পেরিয়ে বাকিটা পথ ভ্যানে করে তিন কিলোমিটার দূরের এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যান স্মৃতি।

ভবানীপুর ফাজিল সিনিয়র মাদরাসায় গিয়ে দেখা গেছে, ভ্যান থেকে নামার পরপরই স্মৃতির ব্যাগটি নিতে এগিয়ে আসেন এক সহপাঠী। এরপর সবাই মিলে এগিয়ে যান শ্রেণিকক্ষে। ক্লাস শেষে সহপাঠীদের সহযোগিতায় বেঞ্চ থেকে মাটিতে নেমে দুই হাতে ভর দিয়ে কমনরুমে যান। শারীরিক এ প্রতিবন্ধিতার মধ্যেও সব সময় হাসি যেন লেগেই থাকে স্মৃতির মুখে। মাদরাসা ছুটি হলে সহপাঠী কিংবা শিক্ষকরা আবার তাকে ভ্যান-রিকশায় তুলে দেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা নিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দেখেন স্মৃতি। নারী শিক্ষায় উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রাখারও ইচ্ছা তার। আবেদা আঞ্জুম স্মৃতি বলেন, ছোটবেলায় সবাই খেলাধুলা করলেও আমি পারতাম না। আমার খুব কষ্ট হতো এ ভেবে যে কেন আমি শারীরিকভাবে এমন হলাম। আমি ভালো থাকলে তো সবকিছু করতে পারতাম, সবার সঙ্গে খেলাধুলা করতে পারতাম।

স্মৃতি বলেন, যদিও আমার পড়াশোনা শুরু করতে কয়েক বছর দেরি হয়েছে। কিন্তু আমি চেয়েছি পড়াশোনা করবোই। বাড়ি থেকে সে ব্যাপারে সহযোগিতা পেয়েছি। তবে আশপাশের মানুষ বলতেন লেখাপড়া করে কী হবে। এছাড়া অনেক কথাই শুনতে হয়েছে। কিন্তু আমি থেমে যাইনি। কারণ লেখাপড়া না করলে কোনো কিছু করা সম্ভব নয়। তাই অনেক কষ্ট হলেও পড়াশোনা চালাচ্ছি।

আমার ইচ্ছা আমি চাকরি করব। তাই এত কষ্ট করে লেখাপড়া করছি। আশা করি আমি দেশের জন্য কিছু একটা করতে পারব, নারী শিক্ষায় অবদান রাখতে পারব বলে জানান অদম্য এ স্মৃতি। এ লড়াইয়ে অবশ্য ছায়া হয়ে পাশে রয়েছে তার পরিবার। প্রেরণা দিচ্ছেন সহপাঠী-শিক্ষকরাও।

স্মৃতির মা সুফিয়া খাতুন বলেন, মেয়েটি হওয়ায় আমি চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। তখন অন্য ছেলে-মেয়েরাও ছোট ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে মানিয়ে নিয়েছি। এখন স্মৃতি অনেক কিছুই করতে পারে। ভালো করে পড়াশোনাও করছে। পরীক্ষায় ভালো ফলাফলও করেছে। পড়াশোনা নিয়ে মানুষজন অনেক টিটকারি করেছে, নানাজন নানা কথা বলেছেন কিন্তু আমরা সেসব কানে নেইনি। স্মৃতি অনেক চেষ্টা করে। তাকে নিয়ে এখন আমার অনেক স্বপ্ন।

ভাই ফখরুল ইসলাম বলেন, ছোটবেলা থেকেই স্মৃতির লেখাপড়ার আগ্রহ ছিল। তখন আমরাও আমাদের পক্ষ থেকে যতটুকু চেষ্টা করার তা করেছি। আর এত কষ্ট করে এতদূর এগিয়ে গেছে দেখে আমাদেরও অনেক ভালো লাগে।

ভবানীপুর ফাজিল সিনিয়র মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা মোবারক আলী বলেন, লেখাপড়ার প্রতি স্মৃতির যথেষ্ট আগ্রহ। পড়াশোনার ক্ষেত্রে আমরাও তাকে সব ধরনের সহযোগিতা করি। পড়াশোনা করে একদিন সে চাকরি করবে এবং দেশ গড়ার কাজে নিজেকে আত্মনিয়োগ করবে বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। যারা সুস্থ-সবল এবং বাবা-মায়ের অবাধ্য সন্তান, তাদের স্মৃতির জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে ভালোভাবে পড়াশোনা করা উচিত।