ঢাকাTuesday , ১১ মে ২০২১

সরকার নির্ধারিত সময়ে ঈদের আগে বেতন হয়নি ২৮১৮ পোশাক কারখানায়

নিউজ পোর্টাল ২৪
মে ১১, ২০২১ ২:৪৪ পূর্বাহ্ন
Link Copied!

ডেস্ক রিপোর্ট:: শ্রম মন্ত্রণালয় ও পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে ০৯ মের মধ্যে কারখানাগুলোকে শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস পরিশোধে সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গতকাল ১০ মে দুপুর পর্যন্ত ২৮১৮টি অর্থাৎ ৩৫ শতাংশ কারখানায় বেতন পরিশোধ হয়নি।

অন্যদিকে, বোনাস পরিশোধ হয়েছে ৫২২৭টি কারখানায়। অর্থাৎ ৩৩ শতাংশ কারখানায় বোনাস পরিশোধ হয়নি। মোট ৭৮৯২টি পোশাক কারখানার এই চিত্র উঠে এসেছে শিল্প পুলিশের জরিপে।

শিল্প পুলিশের তথ্য বলছে, ‘দেশে বেপজা ও অন্য এলাকায় বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএর সদস্যভুক্ত মোট ৭৮৯২টি গার্মেন্টস আছে। গতকাল দুপুর ১২টা পর্যন্ত এসব কারখানার মধ্যে এপ্রিলের বেতন দিয়েছে ৫০৭৪টি কারখানা (প্রায় ৬৫ শতাংশ)। বোনাস দিয়েছে ৫২২৭টি কারখানা (প্রায় ৬৭ শতাংশ)।’

করোনাকালে আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের চাহিদা কমে যাওয়ায় অর্ডার কমেছে। ফলে দেশি কারখানাগুলোতে উৎপাদন কমে যাওয়ায় শ্রমিকদের ওভারটাইমও কম হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অনেককে মূল বেতনের ওপর চলতে হচ্ছে। আবার করোনার কারণে অনেক শ্রমিক চাকরিহারা হয়ে দীর্ঘদিন বেকার থেকে নতুন কাজ শুরু করেছেন। তাদের জমেছে দীর্ঘদিনের ঋণের বোঝা।

এখন বেতনটুকুই তাদের সংসার চালানোর মূল উৎস। অথচ ঈদের আগে বেতন না হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন অনেক কারখানার শ্রমিক। তাদের একটিই চাওয়া- করোনার মধ্যে মানবিকদিক বিবেচনায় নিয়ে যেন কোনো শ্রমিক ‘বেতন-বোনাস’ থেকে বঞ্চিত না হন।

তবে পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, গতকাল পর্যন্ত ৯০ শতাংশ কারখানায় বেতন পরিশোধ হয়েছে। বাকি ১০ শতাংশ কারখানায় আজ মঙ্গলবারের মধ্যে বেতন পরিশোধ করা হবে। বোনাস পরিশোধ করা হয়েছে ৯২ শতাংশ কারখানায়। বাকি ৮ শতাংশ কারখানা আজকের মধ্যে পরিশোধ করবে।

কিন্তু বিজিএমইএর এই তথ্যের সঙ্গে একমত হতে পারছে না শ্রমিক পক্ষ। তারা বলছেন, মালিকপক্ষ সবসময় বিভ্রান্তমূলক তথ্য দেয়। এখনো ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কারখানায় বেতন পরিশোধ হয়নি। আর বোনাস হয়নি ৪০-৫০ শতাংশ কারখানায়।

বেতন ইস্যুতে বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, এখন পোশাকশিল্প কঠিন সময় পার করছে। করোনার প্রথম ঢেউয়ের বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে এখনো কারখানাগুলো হিমশিম খাচ্ছে। তা ছাড়া বিশ্বব্যাপী পোশাকের খুচরা দাম কমে গেছে। তাই অর্ডার আগের তুলনায় অনেক কম। এমন সময়ে দ্বিতীয় ঢেউ বিশাল ধাক্কা। হাজারো সমস্যা সত্ত্বেও ৯০ ভাগ কারখানায় এপ্রিল মাসের বেতন এবং ৯২ শতাংশ কারখানায় বোনাস দেওয়া হয়েছে। কিছু কারখানায় বেতন-বোনাস নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। সেগুলো নজরে রেখে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে।

শিল্প পুলিশের জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ‘বিকেএমইএর সদস্যভুক্ত কারখানাগুলো বেতন-বোনাস দেওয়ায় পিছিয়ে আছে। মোট ৮১৬টি কারখানার মধ্যে ৪১০টিতে বেতন দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক কারখানায় বেতন দেওয়া হয়নি। অবশ্য বোনাস দেওয়া হয়েছে মাত্র ২৫০ কারখানায়। উল্টো চিত্র বিজিএমইএ সদস্যভুক্ত কারখানার। এক হাজার ৬৪৩টি কারখানার মধ্যে বেতন বাকি আছে ৩৭৪টিতে। আর বোনাস বাকি ৫৫৮টি কারখানার।’

শ্রমিক নেতা বাবুল আক্তার বলেন, সবসময় দেখেছি বিজিএমইএ মনগড়া তথ্য দেয়। তাদের তথ্য সঠিক নয়। এখনো প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কারখানায় বেতন হয়নি, বোনাস হয়নি প্রায় ৪৫-৫০ শতাংশ কারখানায়। ছোট-মাঝারি কারখানাগুলোর কথাতো বাদই দিলাম।

যখন পরিস্থিতি ভালো দেখে, তখন ছোট-মাঝারি কারখানাগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে বিজিএমইএ। আর পরিস্থিতি খারাপ দেখলে বলে ওগুলো আমাদের সমস্যা না। তা হলে এ শ্রমিকদের দেখবে কে?

বাবুল আক্তার মালিকদের প্রতি জোর অনুরোধ করেন, ‘তারা যেন আজকের মধ্যে শ্রমিকদের সব পাওনাদি পরিশোধ করে দেন। তিনি আরও বলেন, মালিকরা সরকারের কাছে যেতে পারে, নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা নেন, কিন্তু শ্রমিকরা কার কাছে যাবে? তাদের তো কারখানার মালিক ছাড়া অন্য কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই।’

এদিকে নিটওয়্যার পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, আশা করি শতভাগ কারখানায় বেতন-বোনাস পরিশোধ হবে। কারখানা মালিকদের জোরালোভাবে অনুরোধ করা হয়েছে। তারা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। আমাদের সদস্য কারখানাগুলোর ৯৫ শতাংশ বোনাস-বেতন পরিশোধ করেছে। কাল (মঙ্গলবার) শতভাগ কারখানায় বেতন-বোনাস দেওয়া হবে। এখন পর্যন্ত কোথাও কোনো অসন্তোষের খবর আসেনি। একটি কারখানায় সমস্যা হতে পারে। মালিক কারখানা তালা মেরে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন। ওই মালিককে খুঁজে বের করতে পুলিশের সহায়তা চাওয়া হয়েছে।

শ্রমিক নেতা জলি তালুকদার বলেন, আমাদের কাছে এখনো সঠিক তথ্য আসেনি। আজকে বোঝা যাবে। ঈদের আগে মালিকরা সবসময় গোঁজামিলের আশ্রয় নেন। শেষ কর্মদিবস পর্যন্ত সময় নেন যাতে শেষ দিন কিছু না করা যায়। শেষ দিনে বেতন-বোনাস পরিশোধ না করেই কারখানা বন্ধ করে দেন, যাতে পরের দিন কেউ বলতে না পারে। মালিকদের প্রতি অনুরোধ জানাই- তারা যেন আজকের মধ্যে পাওনাদি পরিশোধ করে দেন।

গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনি বলেন, মহামারীর মধ্যে শ্রমিকরা অনেক কষ্টে আছেন। অনেক কারখানায় কাজ কমেছে। ওভারটাইম না থাকায় আয় কমেছে। এমন পরিস্থিতিতে বেতন-বোনাসটুকুই তাদের সম্বল। অথচ অনেক কারখানাই এখনো বেতন-বোনাস পরিশোধ করেনি- এটা দুঃখজনক। অনেক বড় কারখানার মালিকরাও এখনো বেতন-বোনাস পরিশোধ করেননি। তারা আজকের দিন পর্যন্ত সময় নিয়েছে।

তবে বড়দের ধরা গেলেও ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোতে এখনো বেতন-বোনাস কিছুই হয়নি। তারা আদৌ দিতে পারবে কিনা এ নিয়েও শঙ্কা রয়েছে। তাদের দেখার কেউ নেই। মালিকদের প্রতি অনুরোধ জানাই- তারা যেন আজকের মধ্যে শ্রমিকদের পাওনাদি পরিশোধ করে দেন। নইলে উদ্ভুত পরিস্থিতির জন্য শ্রমিকরা দায়ী থাকবেন না। সোর্স: আমাদের সময়